বিইআরসি বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রস্তাবের বিষয়ে আজ বেলা ৩টায় তাদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে বলে জানিয়ে গতকাল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণা হলে ১ জুন থেকে তা কার্যকর হবে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গতকাল রাতে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রস্তাবের বিষয়ে আগামীকাল (আজ) কমিশনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।’ তবে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম কত শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে জানতে চাইলে সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে শতাংশের হিসাবে তা হবে দেড় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২১ দশমিক ৪৬ ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।
এর আগে বিদ্যুতের বাল্ক (পাইকারি) মূল্যহার বৃদ্ধির জন্য বিইআরসিতে প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি ও বিদ্যুৎ বিতরণের ছয়টি কোম্পানি। তাদের প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে দুদিন গণশুনানি করে বিইআরসি।
বিপিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা (১৭ শতাংশ) থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা (২১ শতাংশ) পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। এটি মূল্যায়ন করে বিইআরসির কারিগরি কমিটি গণশুনানিতে জানায়, বর্তমান দামে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে বিপিডিবির ঘাটতি হবে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। এটি মেটাতে হলে ভারিত গড়ে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ দাম বাড়ানো প্রয়োজন। তবে আগের ধারাবাহিকতায় সরকারের ভর্তুকি বিবেচনায় নিয়ে মূল্যহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। বর্তমান দামে বিপিডিবির ঘাটতি হতে পারে প্রায় ৬০ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা।
বিপিডিবি তাদের প্রস্তাবে জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যয় পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২ টাকা ৯১ পয়সার মতো। বিদ্যমান পাইকারি দামে বিদ্যুৎ বিক্রিতে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানো হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি আর ১ টাকা ৫০ পয়সা (২১ শতাংশ) হারে দাম বাড়লে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
বিইআরসির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি ২০ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কিছু বলতে চাননি সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৭০ থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, যা শতাংশের হিসাবে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। এর মধ্যে বিপিডিবি খুচরা বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ১ টাকা ৭৭, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ১ টাকা ৫৪, ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি বা ডেসকো ১ টাকা ৯৮, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ১ টাকা ৩৯ ও নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি বা নেসকো ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ২ টাকা ৫ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে।
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি গড়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। কমিশন সেই সুপারিশ গ্রহণ করতে পারে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে তা সাধারণ মানুষ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দাম বাড়ালে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ঝুঁকিতে পড়বে বলে বিইআরসির গণশুনানিতে জোর সমালোচনা করেছিলেন অংশগ্রহণকারীরা।